
মাঠ প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি)। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, ভূমি প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, সরকারি বরাদ্দ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ জেলার যাবতীয় প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এই চেয়ার। বলা হয়ে থাকে, ডিসি হলেন জেলা পর্যায়ে সরকারের ‘মুখ ও চোখ’। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মাঠ প্রশাসনের এই সর্বোচ্চ পদটি নিয়ে একের পর এক যেভাবে আর্থিক লেনদেন, গোপন চুক্তি ও শত কোটি টাকার তদবিরের অভিযোগ সামনে আসছে, তাতে জনমনে এখন এক বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ডিসি পদ কি আসলেই জনসেবার দায়িত্ব, নাকি এটি কোনো অসাধু মহলের ‘কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রকল্প’
সম্প্রতি কুমিল্লা জেলার ডিসি পদায়ন নিয়ে ওঠা এক চাঞ্চল্যকর কেলেঙ্কারি দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও বিসিএস ক্যাডারের একজন উপসচিব কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন পেতে একটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে প্রায় ৮ কোটি টাকার গোপন আর্থিক চুক্তি ও অঙ্গীকারনামা সই করেছিলেন। আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, এই চুক্তিপত্রটি নাকি চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এই সংক্রান্ত নথি ও প্রমাণাদি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছালে এই জঘন্য পদায়ন বাণিজ্য ফাঁস হয়ে যায়। সরকারি সূত্রগুলোও স্বীকার করেছে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কুমিল্লার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নওগাঁর ডিসি পদ পাওয়ার আশায় আরও এক কর্মকর্তার ৩ কোটি টাকার চেক লেনদেনের অভিযোগ গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। পর পর এমন ঘটনা মাঠ প্রশাসনের সততা, নৈতিকতা এবং সামগ্রিক কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রশ্ন,কুমিল্লা, নওগাঁ বা সুনির্দিষ্ট কিছু জেলার প্রতি কর্মকর্তাদের এত তীব্র আকর্ষণ কেন? এর ভেতরের সমীকরণটা খুব সহজ। কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের মতো অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও ভৌগোলিক গুরুত্বসম্পন্ন জেলাগুলোতে শত শত কোটি টাকার বড় বড় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প চলে। এখানে বার্ষিক এডিপি (ADP) বরাদ্দ বেশি, ভূমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বিপুল, এবং বালুমহাল, হাটবাজার ও বড় বড় সরকারি ইজারা থেকে বিপুল পরিমাণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা খাটানোর সুযোগ থাকে।
কিন্তু একজন আমলা বা সরকারি কর্মকর্তা যদি একটি প্রশাসনিক চেয়ারে বসার জন্য অগ্রিম ৮ কোটি টাকা ‘বিনিয়োগ’ করেন, তবে সাধারণ মানুষ কেন ধরে নেবে না যে পদে বসার পর তিনি প্রথম সুযোগেই সুদে-আসলে সেই টাকা তোলার মিশনে নামবেন।
বিপুল অর্থ দিয়ে পদায়ন কিনে যখন একজন কর্মকর্তা জেলায় যান, তখন তার পক্ষে আর সততার সাথে জনসেবা করা সম্ভব হয় না। এর ফলে জন্ম নেয় এক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট। উপজেলা প্রশাসন (ইউএনও), ভূমি অফিস (এসি ল্যান্ড) এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের ওপর তখন অবৈধ অর্থ আদায়ের অলিখিত চাপ তৈরি হয়। এর সরাসরি খেসারত দিতে হয় দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষকে। নামজারি, লাইসেন্স বা যেকোনো সাধারণ নাগরিক সেবা পেতে পদে পদে মানুষকে হয়রানি ও ঘুষের মুখোমুখি হতে হয়।
তবে আশার কথা হলো, সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত এসব প্রমাণাদি পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল ‘বদলি’ বা ‘ওএসডি’ করাই কি এর স্থায়ী সমাধান
মাঠ প্রশাসনের ঐতিহ্য ও সততা ফিরিয়ে আনতে হলে এখন কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, ডিসি নিয়োগের জন্য কর্মকর্তাদের মেধা, সততা এবং বিগত কর্মজীবনের আমলনামা কঠোরভাবে যাচাই করে একটি স্বচ্ছ ‘ফিট লিস্ট’ তৈরি করতে হবে, যেখানে তদবির বা টাকার কোনো ভূমিকা থাকবে না। দ্বিতীয়ত, পদায়নের আগে ও পরে কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ধরণের পদায়ন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মাধ্যমে ফৌজদারি মামলা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাঠ প্রশাসনের পদ যদি টাকার খেলায় পরিণত হয়, তবে তার চূড়ান্ত ভুক্তভোগী হয় দেশের সাধারণ মানুষ, আইন এবং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। ডিসি পদ কোনো ‘মধুর হাঁড়ি’ বা ব্যবসা ক্ষেত্র নয়। জনমনে প্রশাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে এই ‘পদায়ন বাণিজ্য’ সিন্ডিকেটকে কঠোর হস্তে উপড়ে ফেলার এখনই সময়।